বেতার উপস্থাপনা

একজন উপস্থাপক যে কোনও অনুষ্ঠানের সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। বেতার উপস্থাপককে বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে হয়। এর মধ্যে থাকে বেতার ম্যাগাজিন, ফিচার, স্পট রিপোর্টিং এবং সংবাদ বুলেটিনসহ আরো নানা ধরণের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং শ্রোতার কাছে সহজে অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার গুরু দায়িত্ব অর্পিত থাকে উপস্থাপকের উপর। উপস্থাপনার মূল কাজ হচ্ছে শ্রোতার সাথে যোগাযোগ স্থাপন। শ্রোতাকে অনুষ্ঠানের সাথে ধরে রাখা একং অনুষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা। শুধুমাত্র কন্ঠস্বরের উপর ভিত্তি করে কাজটি করা খুবই কঠিন সন্দেহ নেই, তবে অসম্ভব মোটেই না।

বেতার বাংলা পৌষ-মাঘ ১৪২৭/ মহান বিজয় দিবস ২০২০ সংখ্যায় “বেতার উপস্থাপনা” শীর্ষক লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

বেতার উপস্থাপনার ক্ষেত্রে, প্রথমেই যে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন সেটি হল শব্দের সহজবোধ্যতা। উপস্থাপনার ভাষা হওয়া উচিত সহজ এবং প্রচলিত শব্দের সম্ভারে গড়া বাক্য। যা বলছেন সেটা মানুষকে বলার মধ্য দিয়ে বুঝাতে হবে। সুতরাং কোনও অনুষ্ঠান সফলভাবে উপস্থাপন করতে হলে অনুষ্ঠানের বিষয় সম্পর্কে যেমন স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন, একইভাবে সহজ ভাষায় সাবলীল ভঙ্গিতে কন্ঠে স্বরে প্রয়োজনীয় রসায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে বোধগম্য বার্তা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাও একজন উপস্থাপকের থাকতে হয়। একজন বেতার উপস্থাপক তার কন্ঠস্বরের মাধ্যমে কোন পান্ডুলিপি পাঠ করেন না বরং বলা যেতে পারে তিনি তার শ্রোতাকে নির্দিষ্ট পান্ডুলিপির বক্তব্য গল্পাকারে পরিবেশন করেন। কাজটি ভালভাবে করার জন্য প্রয়োজন পান্ডুলিপির বিষয় সম্পর্কে ভালভাবে জানা। একটি উদাহরণ দিই। বেতার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিত্য ব্যবহৃত একটি ফরম্যাট হচ্ছে সংবাদ। শ্রোতার নিকট এটি নিঃসন্দেহে সিরিয়াস একটি বিষয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে, কঠিন শব্দ ব্যবহার করে খবর না লিখলে ও গুরুগম্ভীরভাবে তা পরিবেশন না করলে সংবাদ গ্রহণযোগ্য হবে না। বিবিসি বাংলার সিনিয়র প্রযোজক মানসী বড়ুয়ার মতে, এই ধারণা সঠিক নয়। তাঁর মতে “মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, আপনি সংবাদে যেটা পড়ছেন সেটা শ্রোতা বুঝতে পারছে কিনা, আপনি তার কাছে পৌঁছতে পারছেন কিনা। সংবাদপাঠক হিসাবে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আপনার পড়ার স্টাইলও শ্রোতার কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতার জন্য জরুরি।” সংবাদ পাঠ, মূলত ঘটনা ও তথ্যকে তুলে ধরে, তাই সংবাদ পরিবেশনের সময় কণ্ঠে কর্তৃত্বের প্রকাশ ও আবেগহীনভাবে তা পরিবেশন করা গ্রহণযোগ্য। একইসাথে পরিবেশনার স্টাইল যেন আবার একঘেঁয়ে না হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতে হয়। একইভাবে, সাক্ষাৎকার গ্রহণের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারদাতার আবেগের সাথে একাত্ম হওয়া মোটেই একজন উপস্থাপকের দক্ষতার বিকাশে সহায়ক নয়। এই প্রসঙ্গে মানসী বড়ড়ুয়ার পরামর্শ, “এসব ক্ষেত্রে যার সঙ্গে কথা বলছেন তার আবেগ দ্বারা আপনি যেন প্রভাবিত না হন। আপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ যার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন তাকে বিচলিত না করে, যে তথ্য জানার জন্য আপনি তার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সাফল্যের সঙ্গে বের করে আনা।” বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “মানুষের মস্তিষ্ক ২৮ সেকেন্ডের মত তথ্য একসঙ্গে নিতে পারে। কাজেই খুব লম্বা বাক্য, কঠিন শব্দ ব্যবহার করলে, বাক্যের শুরু ও শেষ কোথায়? -সে সম্পর্কে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলতে পারে”।  এ কারনেই শ্রোতার দ্রুত বোধগম্যতার জন্য প্রচলিত এবং সহজবোধ্য শব্দের ব্যবহার বেতার উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

সংবাদ ও সাক্ষাৎকার ব্যতীত অন্য ধরণের অনুষ্ঠানের উপস্থাপন প্রসঙ্গে এবার একটু আলোচনা করি। বিবিসি’র সাবেক উপস্থাপক কেইট কুকার-এর মতে, একজন ভাল উপস্থাপক নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনার সময়ে চারটি বিষয়ে খেয়াল রাখেন। এগুলো হলো Relevant, Informative, Connecting, Entertaining। তিনি এই চারটি বিষয়কে ইংরেজী বর্ণমালায় সাজিয়েছেন “RICE” শিরোনামে। কেইট কুকার-এর মতে, প্রদেয় বক্তব্য হতে হবে প্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, বক্তব্য হতে হবে তথ্যমূলক। তৃতীয়ত, কাঙ্খিত শ্রোতার  জীবনের সাথে বক্তব্য হবে কানেক্টিং বা এনগেজিং এবং চতুর্থত, বক্তব্যে থাকতে হবে বিনোদনমূলক বা এন্টারটেইনিং উপাদান। উপস্থাপনার সময়ে একজন যোগ্য উপস্থাপক সঠিক ঢঙে এই বিষয়গুলোর মিশেল যত বেশী করাতে পারবেন, তত বেশী ঋদ্ধ হবে বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা। আরো একটি উদাহরণ দিই। ধরা যাক, একজন উপস্থাপক করোনাভাইরাস সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন।  এই ক্ষেত্রে প্রথমত, তার বক্তব্যে করোনাভাইরাস বিষয়ে প্রাসঙ্গিক বক্তব্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এরপর  প্রয়োজন কিছু নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য, যা শুনে শ্রোতা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিজের আচরণের পরবির্তন ঘটাতে পারবেন। এরই সাথে প্রয়োজন কিছু জীবন ঘনিষ্ঠ বাস্তব কেস স্টাডির উদাহরণ, যা  শ্রোতাকে উপস্থাপকের কথা বিশ্বাস করতে তাড়িত করবে। সর্বশেষ প্রয়োজন, করোনা জয়ের কিছু বিনোদনমূলক তথ্য-উপাত্ত। এই ভাবে শ্রোতার বয়স ও রুচিকে প্রাধান্য দিয়ে একজন উপস্থাপক যখন সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় মত্ত হবেন, শ্রোতা আকর্ষণে কাজটি নিঃসন্দেহে আর কঠিন থাকে না।

বিবিসি’র সাবেক উপস্থাপক কেইট কুকার-এর মতে, একজন ভাল উপস্থাপক নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনার সময়ে চারটি বিষয়ে খেয়াল রাখেন। এগুলো হলো Relevant, Informative, Connecting, Entertaining। তিনি এই চারটি বিষয়কে ইংরেজী বর্ণমালায় সাজিয়েছেন “RICE” শিরোনামে।

বেতার স্টুডিওতে কর্মরত উপস্থাপকদের কয়েকজন।

ট্রাফিক সম্প্রচার কার্যক্রম, এফ এম ৮৮.৮ মেগা হার্জ, বাংলাদেশ বেতারে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, শিল্পী হিসেবে উপস্থাপনা দক্ষতার উন্নয়ন ও উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জনের জন্য একজন বেতার উপস্থাপকের নূন্যতম চারটি বিষয়ে চর্চা খুবই প্রয়োজন। সংক্ষেপে এই গুণগুলোকে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে “উদভাস”। আরো ব্যাখা করে বলছি। প্রথমত, শিল্পীর প্রমিত উচ্চারণ, বাচন ভঙ্গী, প্রক্ষেপণ যথাযথ হবার পাশাপাশি উপস্থাপককে শ্রোতা/ অংশীজনদের রুচি ও আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। শ্রোতার সাথে সম্পর্ক চলমান রাখার জন্য বক্তব্য উপস্থাপনে সাবলীল হতে হবে এবং কোথায় বক্তব্য থামাতে হবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপস্থাপক কথা বলার সময় বিষয়বস্তুর তিনটি ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিবেন। এগুলো হলো: তিনি কি বলছেন? কেন বলছেন? এবং কাকে বলছেন? এই তিনটি বিষয় উপস্থাপক যখন জানেন, তখন তার পান্ডুলিপি পাঠ, পড়ার মত থাকে না বরং হয়ে উঠে বলার মত করে পড়া। উপস্থাপক এমনভাবে শ্রোতা ও অংশীজনের সাথে কথা বলবেন, যেন মনে হয় তিনি একটি গল্প বলছেন। তৃতীয়ত, উপস্থাপক তার কাজকে ভালবাসবেন, শব্দের উচ্চারণ সঠিকভাবে করবেন এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তিনি রাখবেন।  যে বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, সে বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকার পাশাপাশি অবশ্যই মাইক্রোফোনের ব্যবহার সম্পর্কেও পূর্ব ধারণা রাখবেন। চতুর্থত বলব, প্রতিটি উপস্থাপকের একটি স্বপ্ন থাকতে হবে, স্বপ্ন দেখার চর্চা করতে হবে। শিখার আগ্রহ থাকতে হবে। অন্যদের উপদেশ গ্রহণের মত মানসিকতাও থাকতে হবে। -এই গুণগুলো একজন উপস্থাপকের থাকলে এবং গুণগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখলে অবশ্যই সময়ের আবর্তনে দেশের  একজন সেরা বাচিক শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পথ প্রশস্থ হয়। 

এবারে আসি একজন ভাল উপস্থাপকের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায়। ভাল উপস্থাপক হবার জন্যে এবং মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অস্তিত্ব যথার্থভাবে বজায় রাখার জন্য উপরের গুণগুলো চর্চার পাশাপাশি মোটের উপর চারটি বৈশিষ্ট্য একজন শিল্পীর থাকা প্রয়োজন। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখা করতে পারেন, তবে কাজের অভিজ্ঞতায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে এই চারটি বৈশিষ্ট্য হলো সময়নিষ্ঠতা, শ্রদ্ধাবোধ, প্রয়াস প্রবণতা ও পারদর্শীতা।  আমার বিবেচনায় সংক্ষেপে সমশ্রদ্ধাপ্রদর্শী মডেল । আরেকটু ভেঙে বলি। প্রথমত, একজন ভাল উপস্থাপক সব সময়ই সময়নিষ্ঠ হয়ে থাকেন। ভোর সাতটা এর অর্থ সকাল ছয়টা বেজে ঊনষাট মিনিট ষাট সেকেন্ড। সুতবাং, সাতটা বাজে অনুষ্ঠান উদ্বোধন কথার অর্থ হচ্ছে সকাল ছয়টা বেজে ঊনষাট মিনিট ষাট সেকেন্ড-এর পূর্বে দপ্তরে এসে উপস্থিত হওয়া।  এটি তিনি বুঝেন এবং মেনে চলেন।  দ্বিতীয়ত, ভাল উপস্থাপক তার কাজের প্রতি সততার পরিচয় দিয়ে থাকেন। নিজ কাজের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল থাকেন, একইভাবে সহকর্মীদের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকেন। একটি ভাল কাজ নির্মাণের জন্য কতটুকু শ্রম প্রয়োজন তা তিনি জানেন। শ্রমের ব্যবহারে কার্পন্য করেন না। তৃতীয়ত, একজন ভাল উপস্থাপক সব সময়ই নিজের কাজের মানের আরো উন্নয়নে সচেষ্ঠ থাকেন। আত্মতৃপ্তি শিল্পীর সত্বাকে মেরে ফেলে। ভালর শেষ নেই জেনেও, একজন ভাল উপস্থাপক শেষ ভালর জন্য সব সময় অদম্য পরিশ্রম করেন, অগুণণ প্রয়াস রচনা করেন নিরন্তর। সবশেষ বৈশিষ্ট্যটি হল, একজন ভাল উপস্থাপক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত পারদর্শী। সর্বদা বক্তব্যের যথার্থ উচ্চারণ, শব্দ চয়ণ, আবেগ আর গতির ব্যবহারে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে থাকেন। 

উপস্থাপনা বিষয়ক লেখাটি এবার শেষ করবার পালা। বেতার উপস্থাপনার টুকিটাকি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হবে। তবে, শেষ মুহুর্তে বলব, ভাল উপস্থাপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পূর্ব প্রস্তুতী, পূর্ব প্রস্তুতী এবং পূর্ব প্রস্তুতী। আমাদের আলু চৌধুরী, বেতার উপস্থাপনা বিষয়ে বেশ দক্ষ। তবে পূর্ব প্রস্তুতী বিষয়ে খুবই অদক্ষ। একদিন স্টুডিওতে তার বক্তব্যের বিষয় ছিল, “জাতীয় সঙ্গীত শুদ্ধভাবে চর্চা করতে হবে এবং শুদ্ধভাবে গাইতে হবে।” কিন্তু আলু চৌধুরী দক্ষ উপস্থাপক হলেও, পূর্ব প্রস্তুতীর অভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে বসলেন, “জাতীয় সঙ্গীত শুদ্ধভাবে চর্চা করতে হবে, শুদ্ধভাবে গাইতে হবে এবং শুদ্ধভাবে শুনতে হবে। এটাই দেশপ্রেম। আসুন আমরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই”। এধরণের ভুল হাস্যকর হলেও, অবশ্যই ক্ষমার যোগ্য থাকে না। তাই আমাদের সব সময়ই নিজের কাজের প্রতি সতর্ক থাকতে হয়। উপস্থাপনা বিষয়ে শেষ কথাটি হলো, নিজের কণ্ঠের ভালমন্দ বুঝতে পারাটাও ভাল উপস্থাপক হওয়ার একটি অন্যতম শর্ত। কৃত্রিমভাবে বা চেঁচিয়ে কথা না বলে বরং  কিভাবে কথা বললে নিজের কণ্ঠ ভাল শোনাবে সেটি আয়ত্তের চেষ্টা করাও একজন সম্ভাবনাময় উপস্থাপকের জন্য অবশ্য পালনীয়।


-দেওয়ান মোহাম্মদ আহসান হাবীব, উপপরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।

২৪শে ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিঃ।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Copyright © 2020 |Traffic FM Privacy Policy|Site Edited by Deputy Director (Traffic) | Maintained By Director (Traffic) | Supervised By DDG(Programme), Bangladesh Betar | Developed By SA Web Service